বেসরকারি আইটিসি’র মাধ্যমে সরকারি ব্যান্ডউইথ রফতানিতে রাজস্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার শঙ্কা

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০০:০২  

বাংলাদেশের একমাত্র অপারেশনাল সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি’র সঙ্গে যৌথভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যান্ডউইথ রফতানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে আইটিসি (ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল) অপারেটর ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবাল। প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ডিসেম্বর মাসে ফাইবার অ্যাট হোম আইটিসিকে, বিএসসিপিএলসি তাদের প্রণীত আইআইজি ট্যারিফ থেকে অতিরিক্ত ১০% হ্রাসকৃত মূল্যে প্রায় এক টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ ধাপে ধাপে বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএসসিসিএল এর বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহম্মদ এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ৩৫ শতাংশ ছাড়ে এই সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছে বিএসসিপিএলসি এর ব্যান্ডউইথ ক্রয় প্রস্তাব যাচাই বাছাই কমিটি।  তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন অনুমোদন দিয়েছে কি না শেষ খবর পর্যন্ত সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে এই সিদ্ধান্তের কথা ফাঁস হলে ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালের ওই প্রস্তাবকেই নীতিমালা পরিপন্থি উল্লেখ করে আপত্তি তুলেছে আইআইজিসহ (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) অন্য টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের অভিযোগ, ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালের আইটিসি ও আইআইজি দুটো লাইসেন্সই আছে। নীতিমালা অনুযায়ী, সাবমেরিন ক্যাবল থেকে আইআইজি হিসেবে ব্যান্ডউইথ কিনতে পারবে তারা; কিন্তু আইটিসি হিসেবে কেনার সুযোগ নেই। আবার ভারত থেকে আইটিসি হিসেবে ব্যান্ডউইথ এনে দেশে সেবা দেয়ার সুযোগ থাকলেও তাদের ব্যান্ডউইথ রফতানিরও সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে আইআইজি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইআইজিএবি) মহাসচিব আহমেদ জুনায়েদ বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের রাজস্ব আয় এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিবে।

তার মতে, আইটিসি কোম্পানি ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালকে এক টেরাবাইট অর্থাৎ ১০০০ জিবি ব্যান্ডউইথ অতিরিক্ত ১০% কম মূল্যে প্রদান করলে, এসব ব্যান্ডউইথ অন্যান্য আইআইজিকে কমদামে অফার করবে প্রতিষ্ঠানটি।  কিছু আইআইজি ছাড়া মোটামুটি সব আইআইজিগুলো আইটিসির সঙ্গে একটি বান্ডেল প্যাকেজে শিফট করবে। এতে সরাসরি গ্রাহক হারাবে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি।ফলে হুমকির মুখে পড়বে বিএসসিসিএল এর রেভিনিউ। এছাড়াও ফাইবার এট হোম আইআইজি সাবমেরিন ক্যাবলের পরিবর্তে নিজের আইটিসি থেকে ব্যান্ডউইথ নিলে, একই প্রতিষ্ঠান হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে তো তাকে আর ভ্যাট দিতে হচ্ছে না। সুতরাং, তারা ১০ শতাংশ ছাড় পাচ্ছেই। তার সঙ্গে সেই কোম্পানির অ্যাডভ্যান্স ইনকাম ট্যাক্সও দিতে হচ্ছে না, আবার ভ্যাটও দিতে হচ্ছে না। অর্থাৎ, দিনশেষে এখানেই সরাসরি ১৫ শতাংশ রেভেনিউ সরকার পাচ্ছে না।  একইভাবে আইটিসি হিসেবে ব্যান্ডউইথ নিতে সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে ফাইবার অ্যাট হোম যুক্ত হলে সংযোগ পাবে ভারতের ওভারসিস অপারেটরও। সেক্ষেত্রে তারা ভারতের ব্যান্ডউইথ বাংলাদেশের এক সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করিয়ে অন্য সীমান্ত দিয়ে বের করে দেয়ার প্রয়াস নিবেই। তখন সেটি একটি ট্রানজিটের মতো হয়ে যাবে। যা আইটিসি, সাবমেরিন ক্যাবল এবং আইএলডিটিএস পলিসি ২০১০ এর ব্যত্যয়। তাছাড়া, বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কি ধরনের তথ্য বা ডেটা ইন্ডিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে অথবা সিঙ্গাপুর থেকে আসছে তার কোনো রকমের ভিজিবিলিটি কিন্তু নেয়া সম্ভব নয়, যা সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও হুমকি স্বরূপ। সর্বোপরি ফাইবার এট হোম যদি ভারতে অবস্থিত তার ওভারসিস অপারেটরের সাথে অথবা সিঙ্গাপুরের কোন অপারেটরের সাথে বাইলেটারেল সার্ভিস এক্সচেঞ্জ বা দ্বীপাক্ষিক কোন সেবা বিনিময় করে থাকে তাহলে দেশ ফরেন রেমিটেন্স বঞ্চিত হবে। বাইলেটারেল সার্ভিস এক্সচেঞ্জ বলতে বোঝায়, যেমন আইটিসি প্রতিষ্ঠানটি তার সিঙ্গাপুর অপারেটরের কাছে ৩০০ জিবি ক্যাপাসিটি বিক্রয় করল এবং এর পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রা না নিয়ে এর বদলে সমমূল্যের অন্য কোন সেবা তার থেকে নিল। একইভাবে ইন্ডিয়ার কোন ওভারসিস অপারেটরকে ৩০০ জিবি সেবা প্রদান করলো এবং এর পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রা না নিয়ে সমপরিমাণ মূল্যের অন্য কোন সেবা নিল। ফলে বাংলাদেশ সরকার এই ৩০০ জিবির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হতে বঞ্চিত হলো।

তবে এসব যুক্তির বিষয়ে কোনো বিএসসিপিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহম্মদ এর কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি নেয়ার পর ফাইবার অ্যাটহোম গ্লোবালকে বিএসসিসিএল এর কাছ থেকেও অনুমতি নিতে হবে। তারপর একটি রেট নির্ধারণ করা হবে। সেটি বিদ্যমান আইআইজি রেটের সমানও হতে পারে, বা আমরা ছাড়ও দিয়ে থাকতে পারি। তবে সেগুলো আইনকানুন মেনেই করা হবে।’

এমন পরিস্থিতিতে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানে বিএসসিসিএল বিভিন্ন আইআইজি প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রায় ৩০০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সেবা প্রদান করে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা রেভেনিউ আয় করছে। কিন্তু যখন বিএসসিপিএলসি, আইটিসি কোম্পানি ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালকে এক টেরাবাইট অর্থাৎ ১০০০ জিবি ব্যান্ডউইথ অতিরিক্ত ১০% কম মূল্যে প্রদান করবে, তখন এক টেরাবাইট এর স্লাব হবার কারণে ফাইবার অ্যাট হোম অনেক কম মূল্যে আইআইজিগুলোকে সেবা প্রদানের অফার দিতে সক্ষম হবে। অধিকতর কম মূল্যে ফাইবার অ্যাট হোমের মাধ্যমে ইন্ডিয়া ও সিঙ্গাপুরে পৌছানোর সুযোগ পাওয়ার প্রয়াসে অনেক আইআইজি কোম্পানী তখন ফাইবার অ্যাট হোমে স্থানান্তরিত হবে। তার মাঝে গত নভেম্বর মাসে হঠাৎ বিএসসিপিএলসি কর্তৃক অপেশাদার ভাবে ১৯টি আইআইজি প্রতিষ্ঠানকে কোনরকম নোটিফিকেশন ছাড়াই ছুটির আগের দিন রাত ১২ টা থেকে ব্যান্ডউইথ ক্যাপ করার ঘটনাটি অন্যান্য আইআইজিদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ফলে, ঐ ঘটনার পর ইতিমধ্যে অনেক আইআইজি বিএসসিসিএল থেকে তাদের ক্যাপাসিটি কমিয়ে আইটিসিতে নিয়ে গিয়েছে। এরইমধ্যে, এভাবে আরো এক টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ যদি বিএসসিপিএলসি হতে ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালকে দেয়া হয়, তাহলে আরো বেশি আইআইজি ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালে স্থানান্তরিত হয়ে চলে যাবে, ফলে হুমকির মুখে পড়বে বিএসসিপিএলসি এর রেভিনিউ। এর ফলে বিএসসিসিএল এর আনুমানিক ১৬০০ জিপিএস ব্যান্ডউইথ কমে গিয়ে মাসে প্রায় ২৭ কোটি টাকা রেভেনিউ ক্ষতি হবার আশঙ্কা আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএলডিটিএস পলিসি ২০১০ অনুযায়ী, সাবমেরিন ক্যাবল এবং আইটিসি একই লেয়ারের লাইসেন্সি। একই লেয়ারের লাইসেন্স হিসেবে এক আইআইজি যেমন আরেক আইআইজিকে সেবা প্রদান করতে পারে না, এক আইএসপি যেমন আরেক আইএসপিকে সেবা প্রদান করতে পারে না, তেমনি সাবমেরিন ক্যাবল কিভাবে আইটিসিকে সেবা প্রদান করতে পারে অথবা আইটিসি কিভাবে সাবমেরিন ক্যাবলের রিসেলার হতে পারে তা বোধগম্য নয়।  খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, যৌথ অংশীদারিত্বে আপাত দৃষ্টিতে  ফাইবার অ্যাট হোমের কাছে বিএসসিপিএলসি’র ১০০০ জিবি ব্যান্ডউইথ বিক্রয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকা রেভেনিউ আয় হচ্ছে বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে আইআইজি সমূহ হতে ২৭ কোটি টাকা রেভেনিউ চলে যাচ্ছে। ফলে সর্বমোট ক্ষতি হচ্ছে মাসে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, সরকার ও এক্ষেত্রে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। আইটিসিরা তাদের আয়ের ১% অপরদিকে বিএসসিপিএলসি ৩% রেভেনিউ শেয়ার করে থাকে। এক্ষেত্রে বিএসসিপিএলসি এর গ্রাহক এবং ক্যাপাসিটি যখন আইটিসিতে চলে যাবে তখন বিএসসিপিএলসি থেকে মাসে ২৭ কোটি টাকার উপর ৩% হারে যে রেভিনিউ সরকার পেত সেটি পাবে ১০ কোটির উপর।  ফলে রেভিনিউ কমে যাবে উল্লেখযোগ্য হারে। অপরদিকে ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালের রয়েছে নিজস্ব আইআইজি। এই আইআইজি তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এর মালিকানাধীন আইটিসি হতে অন্যান্য আইআইজি অপেক্ষা কম মূল্যে সেবা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা মনোপলি ব্যবসা করার প্রয়াস পাবে। ফলে হুমকির মুখে পড়বে বাকি আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রী বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস সহ দেশে মোট ৭টি আইটিসি রয়েছে। বাকি ছয়টি বেসরকারী আইটিসি গুলো হলো- বিডি লিংক কমিউনিকেশন লিমিটেড, ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবাল লিমিটেড, ম্যাংগো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড, নভোকম লিমিটেড, ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স কমিউনিকেশন লিমিটেড ও সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড।